তোমাতে করিবো বাস - golpo bazar

তোমাতে করিবো বাস পর্ব ২১

তোমাতে করিবো বাস

তোমাতে করিবো বাস পর্ব ২১
লেখনীতে-আফনান লারা

তটিনির চেষ্টায় বাপ্পি উঠতে পারলো তাও অনেক কষ্টে।পা খাটের সাথে না আটকালে উঠতে আরও সহজ হতো।তটিনি কাঁধে ব্যাথা পেয়েছে।সত্তর একাত্তর ওজনের একটা মানুষ গায়ের উপর ধুম করে পড়া কি মুখের কথা??
কাঁধে হাত দিয়ে তটিনি উঃ করে বললো,’ইচ্ছে করে পড়ছেন তাই না!’

‘কলার খোসা ইচ্ছে করে তুমি এখানে ফেলেছিলে যাতে আমি গিয়ে তোমার গায়ে পড়ি।তাই না?’
তটিনি বিড়বিড় করে কিসব বললো যার কোনোটাই বাপ্পি বুঝলোনা।সে নিজেও ব্যাথা পেয়েছে পায়ে।খাটে বসে পা ধরে তাই দেখছিল, তটিনি কাঁধ ধরে নিচে নেমে ড্রেসিং টেবিলের সামনে থেকে মলম তুলে কাঁধে লাগিয়ে নিচ্ছে সসেসময় রুমে আসলো বাপ্পির মা।

পর্ব গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

তিনি বাপ্পিকে পা ধরে চোখ মুখ খিঁচাতে দেখে আন্দাজ করে নিলেন নিশ্চয় বাপ্পি ব্যাথা পেয়েছে।তাই ছুটে এসে জানতে চাইলেন কোথায় ব্যাথা পেয়েছে।বাপ্পি কথাটা চেপে যেতে চাইলেও মায়ের কাছে ধরা খেলো একটা কারণে।আর সেটা হলো ওর পায়ে লাল দাগ বসে গেছে।মা তটিনির হাত থেকে মলম নিয়ে এসে ওর পায়ে লাগাচ্ছেন এখন।তটিনি কাছে এসে ধীর গলায় বললো,’আন্টি আমিও ব্যাথা পেয়েছি।এই দেখেন কাঁধে’

‘ও কিছুনা।কিন্তু বাপ্পির পা দেখো তুমি,, লাল হয়ে দাগ বসে গেছে।মনে হয় রক্ত জমে গেছে।তুমি কি দেখোনি ও কিভাবে ব্যাথা পেলো?’
তটিনি ব্রু কুঁচকে ওখান থেকে সরে গেছে।বাপ্পি প্রথমদিন তাহলে ঠিক কথাই বলেছিল।
আসলেই সে ঠিক বলেছে, এ বাড়িতে ওকে সবাই অনেক বেশি আদর করে।
জানালার সাথে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তটিনি ওকে হিংসা করছে।বাপ্পির মা মলম লাগিয়ে দিয়ে চলে গেছেন গরম দুধ আনতে।

বাপ্পি তখন পেছনে ফিরে তটিনির দিকে তাকালো।তটিনি ওমনি বললো,’কোলে নিয়ে হাঁটবো একটু?এই টুকু ব্যাথায় এত ব্যস্ত হলে আরও বড় আঘাতে কি ঘটে কে জানে!’
আাপ্পি হাসলো তারপর পা নামিয়ে মলম নিয়ে খুড়িয়ে খুড়িয়ে হেঁটে তটিনির কাছে এসে দাঁড়ালো।তটিনিকে অবাক করে দিয়ে মলম নিয়ে সে ওর কাঁধে লাগিয়ে দিতে লাগলো এবার।

তটিনি এটা আসলেই ভাবতে পারেনি বাপ্পি কাছে এসে যে এমনটা করবে।
বাপ্পি মনযোগ দিয়ে মলমটা ভালমতন লাগিয়ে ফু দিয়ে বললো,’এই বাড়ির সবার কাছে আমি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলেও আমার কাছে তুমি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’
এই বলে বাপ্পি আবার গিয়ে আগের জায়গায় বসলো।মা তখনই দুধের গ্লাস নিয়ে আসলেন।
‘কিরে বাপ্পি তুই বুঝি উঠেছিলি?’

‘না তো’
‘তাহলে তোর জুতায় মলম লাগা কেন?কেন উঠেছিল?তটিনিকে বললেই হতো’
‘না আমি উঠি নাই।তুমি এত টেনসন করিওনা’
‘করবোনা টেনসন?কাল তোদের কক্সবাজার যাবার কথা ছিল আর এখন তুই এই ঘটনা ঘটাই রাখলি’
এই বলে বাপ্পির মা নিচে তাকিয়ে কলার খোসাকে মেঝেতে আটকে থাকতে দেখে সেটা তুলে বললেন,’এটাতে পিছলে পড়েছিস তাই তো?কলার খোসা মেঝেতে ফেলার অভ্যাস তো তোর না।এটা নিশ্চয় তটিনি করেছে?
তটিনি?এটা কেমন স্বভাব?তোমার এই বাজে অভ্যাসের জন্য বাপ্পির আজ এই অবস্থা হলো।আর কখনও এইসব করবানা।বাপ্পি খুব পরিষ্কার স্বভাবের ছেলে।তোমাকেও সেরকম হতে হবে।’

মা রাগী চোখে তাকাতে তাকাতে চলে গেলেন।তটিনি গাল ফুলিয়ে তার ট্রলি ব্যাগ টেনে নিজের সব জামাকাপড় গুছানো শুরু করে দিলো।বাপ্পি মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে।তটিনি সব গুছিয়ে নিতেই বাপ্পি বললো,’মায়ের বকার জন্য আমি সরি বলছি।এভাবে রাগ করলে হবে?গুরুজনরা তো একটু আকটু বলেই।গায়ে নেয়ার কি আছে?’

‘আসার পর থেকে এটা করোনা,ওটা করো।ওটা করোনা এটা করে শুনতে শুনতে কান পেকে গেছে আমার।আপনারা এইসব আগে জানিয়ে বিয়ে করবেন না??আরেক পরিবেশের আরেক ঘরের একটা মেয়েকে বিয়ে করে এনে নিজেদের মনমত নিয়ম তার উপর চাপিয়ে দিলে হবে??’

‘তটিনি প্লিজ যেও না।আচ্ছা আমি সবাইকে বুঝিয়ে বলবো যাতে তোমার সাথে ভাল ব্যবহার করে’
তটিনি তাও হাঁটা ধরেছে।বাপ্পি বাধ্য হয়ে বিছানা থেকে নেমে ওকে আটকাতে যেতেই পায়ে ব্যাথা পেয়ে আবারও গিয়ে তটিনির গায়ের উপরই পড়েছে।তটিনি দরজার সাথে লেগে দাঁড়িয়ে আছে।বাপ্পি মাথা তুলে হাত দরজাতে রেখে বললো,’সরি।ব্যালেন্স করতে পারিনি।পায়ে ব্যাথা অনেক।প্লিজ যেও না,মচকে গেছে মনে হয়।আমি কথা দিচ্ছি কেউ আর তোমাকে বকবেনা’

তটিনি গাল ফুলিয়ে বাপ্পির সামনে থেকে সরে গিয়ে বিছানায় উঠে বসে থাকলো।বাপ্পি ড্রয়ার খুলে বিসকুটের প্যাকেট এনে দুধের গ্লাসটা তটিনির দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো,’এই বিসকুটটা দুধ দিয়ে খেতে অনেক মজা।নাও খাও’

রিনি আসিফের হাত শক্ত করে ধরে ঘুমিয়ে আছে।আসিফ এতক্ষণ ওকে ছাড়ানোর সব চেষ্টা চালিয়েও ব্যর্থ হয়ে এখন আর সরানোর চেষ্টা করছেনা। রিনি যেভাবে আছে সেভাবেই ওকে ছেড়ে দিয়েছে।রিনিকে হয়ত আর কোনোদিন ফেরানো যাবেনা।

‘যত যাই বলি না কেন দিনশেষে সে তো আমার বিয়ে করা বউ।না আমি অস্বীকার করতে পারবো আর না রিনি আমায় অস্বীকার করতে দিবে।’
আসিফ গম্ভীর হয়ে বসে আছে।রিনির গালের নরম ছোঁয়া ওর হাতে বারবার করে লাগছে বাসের ধাক্কায়।বুকের ভেতর ধরফর করছে অনবরত।রিনিকে সরিয়ে দিলেই যেন মনে শান্তি লাগতো। কিন্তু সরানো সম্ভব না বলে এটাই সয়ে যেতে হবে।

রিনি পাকাপোক্ত ভাবে ধরে আছে যেন আসিফ তাকে ছেড়ে চলে যেতে পারে সে ভয়ে।
আসিফের ও একই ধারণা হলো।মানুষ এই ভাবনা নিয়ে কখন কাউকে শক্ত করে ধরে?
মানুষটা হাতছাড়া হয়ে যাবার ভয় থাকলেই কেবল শক্ত করে ধরি আমরা।আসিফ সেটা বুঝতে পেরে রিনিকে দূরে সরিয়ে দেয়া বন্ধ করে দিয়েছে।

কুমিল্লাতে বাস বিরতিতে থামলো আসরের নামাজ আদায় করার জন্য।
আসিফ রিনিকে রেখে উঠে চলে গেছে।
কয়েক মিনিট পরেই রিনির ঘুম ভেঙ্গে গেলো আর পাশে আসিফকে না দেখে সে ভয় পেয়ে উঠে দাঁড়িয়ে পড়েছে।আসিফের নাম ধরে কয়েকবার ডাকাডাকি ও করলো তাও কেনো সাড়া পেলোনা।
পাশের সিটে বসা মেয়েটা আসিফকে নামাজ পড়তে যেতে দেখেছে কিন্তু সে রিনিকে ভয় দেখানোর জন্য বললো,’তোমার জামাই তো তোমায় ফেলে চলে গেছে’

রিনি মেয়েটার মুখে হাসি দেখেই বুঝেছে মেয়েটা মিথ্যা বলছে তাই সে বললো,’আরঁ জামাই কি আন্নের জামাইর মতন নি যে বউ থুই দাই যাইবো?আঁই জানি আঁর জামাই কোনো কামে বাহির হইছে।হেতেন অনেক দায়িত্ববান মানুষ।আঁরে থুই জানের মতন মানুষ না’

[আমার জামাই কি আপনার জামাইর মতন যে বউ রেখে চলে যাবে?আমি জানি আমার জামাই কোনো কাজে বের হইছে।উনি অনেক দায়িত্ববান মানুষ। আমাকে রেখে যাবার মতন না’]
এই বলে রিনি মুখ বাঁকিয়ে বসে পড়লো আবার।

‘তটিনি রান্নাঘরে এসে একটা টোটকা বানাচ্ছে বাপ্পির মায়ের আদেশে।তিনি চান বাপ্পিকে কালকের মধ্যেই সুস্থ করে ফেলতে তাই তটিনিকে কাজে লাগিয়ে দিছেন
তটিনি আগে এইসব কাজ করেনি।ওদের বাড়িতে বুয়া আছে।বুয়া সব করতো,তটিনিকে রান্নাঘরে দেখা যেতো না,অনেক আদরের মেয়ে ছিল।আদরের হলেও বিয়েতে তার মত নেয়া হয়নি বলে সে আগের সব আদর ভুলে বাবা মায়ের উপর প্রচণ্ড রকম রেগে ছিল।ওকে যেমন আদর করতো তেমনই মার দিতো বাবা মা দুজনেই।মার দিয়ে আবার আদর করতো।মাঝে মাঝে তটিনি মনে করতো সে ভুল করে ভুল পরিবারে জন্ম নিয়ে ফেলেছে।

বাবার কথা ভাবতে গিয়ে টোটকার গ্লাসে জুস ভেবে সে গিলে খেয়ে নিয়েছে।
সেটা দেখে বাপ্পির মা দিলেন এক চিৎকার। ভয় পেয়ে তটিনি গ্লাস রেখে বললো,’সরি আন্টি।আমি এক্ষুনি আরেকটা বানিয়ে দিচ্ছি’

‘সেটা সমস্যা না। সমস্যা হলো তুমি যে এটা খেলে এখন তো তোমার শরীর খারাপ করবে’
‘কেন?এটা তো উনি ও খাইতেন।তাহলে আমি খেলে কি সমস্যা হতো?’
‘এটা পায়ের ব্যাথা ভাল করার ঔষুধ।যারা সুস্থ মানুষ তারা এটা খেলে হিতের বিপরীত হয়’
‘তার মানে কি হবে আমার এখন?’
‘বমি পাচ্ছে?’

‘না তো।তবে তেতো লাগছে মুখে’
‘আচ্ছা তুমি বরং গিয়ে শুয়ে থাকো।টোটকাটা আমি বুয়াকে দিয়ে বানিয়ে নিচ্ছি ‘
এই বলে বাপ্পির মা তটিনিকে পাঠিয়ে দিলেন।বাপ্পি শুয়ে শুয়ে ফোন টিপছিল।তটিনিকে দেখে ফোন রেখে বললো,’চিৎকার শোনা গেলো।কি হয়েছে ওখানে?’

তোমাতে করিবো বাস পর্ব ২০

তটিনি মুখে হাত দিয়ে দৌড়ে গেলো ওয়াশরুমের দিকে।বাপ্পি কিছুই বুঝলোনা কি হচ্ছে ওখানে।ওমনি সেখানে বুনি এসে বলে,’ভাবী মনে হয় প্রেগন্যান্ট ”
‘চুপ কর বোকা মেয়ে কোথাকার!এত জলদি প্রেগন্যান্ট হয় নাকি!’
‘কিন্তু ভাইয়া আমি তো জানি বিয়ে করলেই সাথে সাথে প্রেগন্যান্ট হয়।’

তোমাতে করিবো বাস পর্ব ২২

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.